ঢাকা | | বঙ্গাব্দ

অরক্ষিত রসূলপুর বধ্যভূমি যেন গোচারণ ভূমি!

author
Reporter

প্রকাশিত : Feb 12, 2026 ইং 138 বার পড়েছে
ছবির ক্যাপশন:
ad728

মাসুদ আলম

কুমিল্লার সদর উপজেলার একটি গ্রামের নাম রসূলপুর (একাত্তরে যার নাম ছিল ফকির হাট)। কুমিল্লা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার উত্তরে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা রসূলপুর রেল লাইনের অধুরে গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তার ধারে একটি উঁচু ফসলি জমিকে বধ্যভূমিতে পরিণত করেছিলেন। ওই উঁচু ফসলি জমিতে প্রায় ৫ শতাধিক যুবক-যুবতী নিজের কবর নিজে করে নিতে হয়েছিল। আজ স্বাধীনতার ৪৯ বছর পরও সেই স্থানটি অরক্ষিত ভাবে পড়ে আছে। ৫ শতাধিক শহীদের সম্মানে নির্মিত হয়েছিল মাত্র একটি স্মৃতিস্তম্ভ। যা দিন দিন ভেঙে পড়ছে অবহেলায় অযত্নে। নেই কোন নামফলক, পতাকা উত্তোলনের বেদি ও সীমানা প্রাচীর। তবে ব্যবহার হচ্ছে গোচরণ ভূমি হিসেবে। ঘাষ খাওয়ার জন্য এর ভিতরে গরু বাধাসহ পাশ্ববর্তী জনসাধারণের খড়-কুটা, গরুর মল ও ধান শুকানোর কাজে ব্যবহার হচ্ছে। 

এদিকে বধ্যভূমিতে রাতের বেলায় আলোর ব্যবস্থার জন্য সদর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওই স্থানটিতে ৮টি সৌরবিদ্যুতের লাইট স্থাপন করা হয়। কিন্তু বর্তমানের সেগুলোর ৮টির মধ্যে ৬ টিই নষ্ট হয়ে পড়ে আছে দীর্ঘদিন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মেম্বার আবু তাহের জানান, রসূলপুর বধ্যভূমিটি স্থানীয়দের যে যার ইচ্ছা সেইভাবে ব্যবহার করছেন। কেউ তার গুরুত্ব বুঝছেন। পাশ্ববর্তী জনসাধারণের বধ্যভূমির ভিতরে খড়-কুটা, গরুর মল ও ধান শুকানোর কাজে ব্যবহার করছেন। আবার কেউ গরু-ছাগল বাধার কাছে ব্যবহার করছেন। অন্ধকার রাতে মাদক ব্যবসায়ীরা এখানে বসে মাদক সেবন করেন। যার কারণে উপজেলা প্রশাসন বধ্যভূমি ৮টি সৌরবিদ্যুতের লাইট স্থাপন করে। বর্তমানে তারমধ্যে ৬টাই নষ্ট। বিষয়টি আমি ইউনিয়ন চেয়ারম্যানকে একাধিকবার জানিয়েছি।    

সরোজমিনে দেখা ও জানাযায়, ৫ শতাধিক মানুষকে হত্যার স্থান রসূলপুর বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মানের পর টাইলস ভেঙে পড়ছে। সীমানা প্রাচীর ভেঙে পড়ে আছে। নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটি “নামে মাত্র স্মৃতিস্তম্ভ”। বধ্যভূমির জায়গা খুবই সংকীর্ণ। নকশা অনুযায়ী স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে ওঠেনি। স্মৃতিস্তম্ভে কোনো পতাকা উত্তোলন বেদিও স্থাপন করা হয়নি। গরু, ছাগল ও বেড়া বাধা হয়। খড়-কুটা, গরুর মল ও ধান শুকানোর কাজে ব্যবহার করছে স্থানীয়রা। মাদক সেবকরা আনন্দের সাথে ব্যবহারসহ বখাটেদের আড্ডাবাজির স্থান হয়ে উঠেছে বধ্যভূমিটি।  

৭১ এর দরিদ্র কৃষক মফিজুল ইসলাম (৬৫) জানান, আমার বাড়ি বধ্যভূমির পাশেই। সংগ্রামে আমি আড়ালে আড়ালে দেখেছি কিভাবে দলে দলে যুবক-যুবতীদের গুলি করে হত্যা করেছে এখানে এনে। গুলি করার আগে তাদের হাতে কবর করা হত, পশ্চিম মুখী করে গুলি করে পা দিয়ে লাথি মেরে কবরে ফেলত। তারপর কোন ভাবে মাটি চাপা দিত। কয়েকদিন পর কুকুরে মরাদেহ গুলোর হাত-পা এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ নিয়ে এদিক সেদিক ছুটাছুটি করতো। সংগ্রাম শেষ হওয়ার অনেক বছর পর এখানে স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মান করে। চারদিকে সীমানা প্রাচীর না থাকায় নেশাখোররা এখানে নেশা করে। এমনকি মানুষের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করছে। যা অত্যান্ত দুঃখজনক। 

কুমিল্লা সোনার বাংলা কলেজের অধ্যক্ষ আবু ছালেক মো. সেলিম রেজা সৌরভ বলেন, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে রসূলপুর বধ্যভূমির পাশ দিয়ে যাওয়া-আসার সময় মানুষের হাড়, খুলি, চুল এবং গুলির খোসা চোখে পড়তো। পরবর্তীতে সরকার এই বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান করলেও দিতে পারেনি তার পূর্ণ মর্যাদা। প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস এবং বিজয় দিবসে বধ্যভূমিতে একবার করে হলেও যদি অনুষ্ঠান করা হয়। তাহলে বধ্যভূমির মর্যাদা ও চেতনা সম্পর্কে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং যুবকদের মনে লালন হত। 

স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধা কাজী আমান উল্লাহ সর্দার জানান, আমি একজন মুক্তিযুদ্ধা হিসেবে দাবী জানাই সরকার যেন খুব শিঘ্রই রসূলপুর বধ্যভূমিকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। যেন ভবিষ্যৎ প্রজম্মের কিশোর ও যুবকরা স্বাধীনতার মর্যাদা ও চেতনা সম্পর্কে জানতে পারে। বধ্যভূমির চারপাশে সীমানা নির্মান করে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও একজন নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দেওয়ার ব্যবস্থা করে। নয় মাস যুদ্ধ করেছি, তার অনেক গভীর ইতিহাস আছে। যা ভুলার মত নয়। 

কুমিল্লা জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সফিউল আহম্মেদ বাবুল বলেন, রসূলপুর বধ্যভূমির অনেক লম্বা ইতিহাস আছে। প্রায় ৫ শতাধিক মানুষের বধ্যভূমি হল রসূলপুর বধ্যভূমি। আমি চাই স্মৃতিস্তম্ভে অন্তত একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও একজন নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। স্মৃতিস্তম্ভে নামফলক বসানো ও নিরাপত্তার জন্য নিয়মিত পুলিশ টহলের ব্যবস্থা করা। যাতে করে স্থানীয়রা মন খুশি মত বধ্যভূমি ব্যবহার করতে না পারে।





নিউজটি আপডেট করেছেন : Reporter

কমেন্ট বক্স
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ ভয়েস অফ কুমিল্লা
সকল কারিগরী সহযোগিতায় A2SYS