
মাসুদ আলম
কুমিল্লার শাসনগাছা ফ্লাইওভার। মহানগর বাসিন্দাদের জন্য এক স্বস্তির নিশ্বাস। নগরীর অন্যতম প্রবেশদ্বার শাসনগাছা ফ্লাইওভার নির্মাণে এই এলাকার চিরচেনা জনদুর্ভোগের চিত্র পরিবর্তন হয়েছে। এলাকার দীর্ঘদিনের সমস্যা রাস্তার যানজট কমিয়ে যানবাহনকে দ্রুত গতিতে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে সহায়তা করছে। কিন্তু স্বস্তির এই ফ্লাইওভারের প্রবেশ মুখে কৃত্রিক জনভোগান্তির সৃষ্টি করছে গণপরিবহনের পাকিং ও সিএনজি চালিত অটোরিকাশ অবৈধ স্ট্যান্ড।
নগরবাসীর অভিযোগ, ফ্লাইওভারের পশ্চিম পাশের প্রবেশ মুখে একপাশে গণপরিহনের পাকিং এবং অন্যপাশে অবৈধ সিএনজি চালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড স্থাপন করা হয়েছে। এতে ফ্লাইওভারে নামতে ও উঠতে যানজটে পড়তে হচ্ছে। প্রায় সময় গাড়ি চললেও ফ্লাইওভারের মাঝখান থেকেই শুরু হয় দীর্ঘ যানজটের। যার কারণে শাসনগাছা ফ্লাইওভারের সেই কাঙ্খিত সুফল পাচ্ছেন না মহানগরবাসীদের দাবি। তারা এই সমস্যার লাগবের জন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন।
গত কিছুদিন পূর্বে কুমিল্লার দুর্গাপুরে রয়েল কোচ বাসের এক সার্ভিস উদ্বোধনে কুমিল্লা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও শাসনগাছার স্থানীয় বাসিন্দা আহমেদ নিয়াজ পাবেল বক্তবে বলেন, শাসনগাছায় ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে মানুষে দুর্ভোগ লাগবের জন্য, ভোগান্তি সৃষ্টির জন্য নয়। ফ্লাইওভার প্রবেশ মুখে অবৈধভাবে সিএনজি চালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ড স্থাপনে মহানগরবাসী প্রতিদিন চলাফেরায় দীর্ঘ যানজটে আটকা পড়তে হচ্ছে। স্ট্যান্ড স্থাপন করে কৃত্রিম যানজট স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তিনি দাবি জানান।
ওই বক্তব্যের সময় কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত উপস্থিত ছিলেন বাসের সার্ভিস উদ্বোধন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে।
অন্যদিকে এই শাসনগাছায় যানজট নিরসনে ৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৩১.২৯ মিটার দৈর্ঘ্যর ফ্লাইওভারটি নির্মাণ করা হলেও নিচে রয়ে গেল সেই পূর্বেল নরক যন্ত্রণা। ফ্লাইওভারের নিচে ভাঙা সড়ক, ফুটপাত দখল, কাদাপানি আর যানজটে চরম ত্যক্ত-বিরক্ত সাধারণ পথচারীরা। ফ্লাইওভারের নিচের পুরো অংশটার দুর্ভোগকে অনেকে নরক যন্ত্রণা বলে উল্লেখ করছেন।
সরেজমিনে নগরীর শাসনগাছা ফ্লাইওভারের নিচে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বিভিন্ন যাত্রীবাহী বাস আটকে আছে ফ্লাইওভারের সরুগলিতে। শাসনগাছা বাস স্ট্যান্ডজুড়ে এলামেলো দাঁড়িয়ে আছে যাত্রীবাহী বাস, সিএনজি চালিত অটোরিকশা, মাইক্রেবাস ও প্রাইভেটকার। একচুল নড়াচড়া করতে পারছে না বাহনগুলো। ট্রাফিক পুলিশকে অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
নাম না প্রকাশ করা শর্তে একজন বাস চালক বলেন, পৌনে দুই ঘণ্টায় ঢাকা থেকে চলে আসছি। কিন্তু আধঘণ্টা লাগছে ফ্লাইওভারের পশ্চিমপার্শ্ব থেকে শাসনগাছা কাউন্টারে বাসটাকে নিয়ে যেতে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট সময় লাগে ফ্লাইওভারের নিচের জায়গা পার হতে। এত গাড়ি এই সরু রাস্তা দিয়ে কেমনে পার হয়? তার ওপর ভাঙা রাস্তা। বাস একবার এদিক কাত হয় তো একবার ওইদিকে কাত হয়। কী যে যন্ত্রণায় আছি!
পাপিয়া পরিবহনের বাস যাত্রী ব্যাংকার খলিলুর রহমান। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৮টায় আসেন। বাসে উঠলেই যানজট পার হয়ে শাসনগাছা থেকে বের হতে গড়ে ২০/৩০ মিনিট লাগে। তারপর চান্দিনা তার কর্মস্থলে পৌঁছান। শুধু শাসনগাছা ফ্লাইওভারের নিচে যানজটের জন্য সঠিক সময়ে অফিসে পৌঁছাতে পারেন না।
ফ্লাইওভারে দু’পাশে পর্যাপ্ত জায়গা নেই। সরু পথ দিয়ে যাত্রীবাহী বাস এক দিয়ে প্রবেশ করলে অন্যদিকে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে দীর্ঘ সময় আটকে থাকে যাত্রীবহনকারী বাহন। ফুটপাতজুড়ে হকারদের দখল। বিশেষ করে বাদশামিয়া বাজার মোড়ে পুরোটাই হকারদের দখলে। ক্ষণে ক্ষণে যানজট সৃষ্টি হয়। এছাড়াও ওই মোড়টিতে রয়েছে একটি সিএনজি অটোরিকশার স্ট্যান্ড। এ যেন মরার উপর খাড়ার ঘা। হকার আর সিএনজি অটোরিকশার দখলে বাদশা মিয়া বাজারের মোড় অংশটি। যানজট লাগলে ওই সড়ক দিয়ে পথচারীদের হাঁটাচলা করা কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়ে।
আবু হানিফ নামের একজন সিএনজি অটোরিকশার চালক জানান, বাদশা মিয়া বাজার মোড়ে প্রতিদিন আমরা টাকা দেই। তাই এখান থেকে যাত্রী তুলে পারাপার করি। কে নেয় এই টাকা এমন প্রশ্নে আবু হানিফ জানান, তাদের নাম বলতে পারবো না। টাকা দেই-টোকেন দেয়।
ফ্লাইওভারের নিচে যানজট নিরসনে কাজ করা এক ট্রাফিক পুলিশ সদস্য জানান, পুরো ফ্লাইওভারের নিচে রাস্তায় ফুটপাত দখল করে আছে হকার। এমন সমস্যায় কিভাবে যানজট নিরসন করা যায়।
কুমিল্লার বাস মালিক সমিতির মহাসচিব মো. তাজুল ইসলাম বলেন, শাসনগাছা ফ্লাইওভারের নিচে কুমিল্লা, ঢাকাসহ আন্তঃজেলা সকল বাস সার্ভিসের টার্মিনাল ও স্ট্যান্ড। ফ্লাইওভারের পশ্চিম দিকের দুইপাশের প্রবেশ পথগুলো খুবই সরু। এছাড়া খানাখন্দ ও গর্তের সৃষ্টি হয়েছে সড়কে। এই ফ্লাইওভারের নিচে বুড়িচং সড়ক, ধর্মপুর সড়কসহ চারদিকের প্রতিটি সড়কে ফুটপাত এবং রাস্তা দখল করে অবৈধ দোকানপাট নির্মাণ করে আছে। যার কারণে এই ফ্লাইওভারের নিচে শৃঙ্খলা আসছে না। অন্যদিকে এখন দেখছি টার্মিনের প্রবেশ পথ এবং ফ্লাইওভারের মুখে সিএনজি চালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড স্থাপন করা হয়েছে। যারকারণে ফ্লাইওভারের পশ্চিম পাশের মুখের যানজট আরও দীর্ঘ হচ্ছে।
তিনি বলেন আমাদের দাবি হচ্ছে, বাস টার্মিনালের অভ্যন্তরে গর্ত ভরাট, অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ এবং গর্ত ও খানাখন্দে ভরা সড়ক মেরামত করা হোক। এছাড়া প্রশাসনকে বলবো যানজট নিরসনে সড়কের উপরে যাতে দাাঁড়িয়ে থেকে যাত্রী উঠা-মানা করাে না পারে সেই জন্য কমিউনিটি পুলিশ নিয়োগ দেয়া হোক। তাদের মাসিক বেতন জেলা বাস মালিক সমিতি দিবে।
এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মো. আহাদ উল্লাহ বলেন, সড়ক সংস্কারের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। তবে শাসনগাছা এলাকায় যানজট হ্রাস করতে হলে বাস্ট্যান্ডটিকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে। এর বিকল্প নেই।